শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ | সময়: বিকেল ৩:১৬

ঘুস নেন দুই ঠিকাদারের থেকে, রেট বেশি দেখে কাজ দেন ইইডি প্রকৌশলী

ঢাকার বাড্ডার এক মাদরাসার উন্নয়নকাজ পাইয়ে দিতে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে। ঘুসের রেট বা পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে পুনঃদরপত্র করে আরেক ঠিকাদারকে কাজটি পাইয়ে দিয়েছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ। অথচ প্রথম যে ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন, তা ফেরত দেননি বলে দাবি ওই ঠিকাদারের।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স। অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী। এ নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঘটনার সময় মনিরুজ্জামান মনি ছিলেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী। সম্প্রতি তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। যদিও অসুস্থতার অজুহাতে তিনি এখনো নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।
মনিরুজ্জামানের বিষয়ে অভিযোগে যা রয়েছে
গত ১৩ আগস্ট শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে লিখিত অভিযোগ দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স। অভিযোগের একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ‌‘সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার (কাজের আইডি নম্বর: ১২৯২১৫৩) উন্নয়নকাজের দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়াকালে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনি ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’

আরও পড়ুন

এসএসসির ফল ‌‘পুনর্মূল্যায়ন ফাঁদ’, শিক্ষার্থীদের গচ্চা ২০ কোটি টাকা

‘কাজটি আমাদের (ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স) অনুকূলে সম্পন্ন করে দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেন এবং আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে তিনি পিসি বাবদ ৪ লাখ টাকা এবং নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারকে দিতে হবে বলে আরও দুই লাখ টাকাসহ মোট ৬ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে অত্যন্ত দুঃখের সাথে পরিলক্ষিত হয় যে, অন্য প্রতিষ্ঠানের সিএস (কাজ দেওয়া) পাঠানো হয়।’
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, ‘সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনি ওই ঠিকাদারের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা অনৈতিকভাবে গ্রহণ করে কাজটি তাদের পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কাজ না পাওয়ার পর আমরা (ওয়ান ক্লাস ট্রেডার্স) মনিরুজ্জামান মনির কাছে ৬ লাখ টাকা ফেরত চাইলে তিনি টাকা ফেরত দেবেন বলে বারবার সময়ক্ষেপণ ও নানান তালবাহানা করতে থাকেন।’
‘দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এখনো পর্যন্ত আমার টাকা ফেরত দেননি। সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনি কর্তৃক প্রতারণামূলকভাবে গৃহীত টাকা দ্রুত ফেরত পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা রক্ষার্থে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার সদয় মর্জি হয়’ বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছে ওয়ান ক্লাস ট্রেডার্স।
দরপত্রের নথি ও চুক্তিপত্রে যা আছে
দরপত্র ও চুক্তির নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর রহিমুল্লাহ মোল্লা মাদরাসার উন্নয়নকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি দরপত্র খোলা হয়। মূল্যায়নে দরপত্রে প্রথম হয় (বিজয়ী) ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স। ২ কোটি ২ লাখ ৮ হাজার ৬১ টাকায় কাজটি পায় ক্লাস ওয়ান। তবে ওই দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের ১৩ জুলাই ওই দরপত্র খোলা হয়। তাতে তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

এক রাতেই বদলি ৪৬ শিক্ষক, মতিঝিল আইডিয়ালে চাঞ্চল্য

ইইডির ঢাকা মেট্রো সার্কেলের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, ওই মাদরাসার উন্নয়নকাজে প্রথমে যে দরপত্র দেওয়া হয়েছিল, তা পেয়েছিল ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্স। কিন্তু ঘুস বেশি পাওয়ায় কৌশলে পুনঃদরপত্র করে তালুকদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দেন মনিরুজ্জামান। দরপত্র মুল্যায়ন কমিটিতে তিনি ছিলেন সদস্যসচিব।
জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান মনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি। আমি কমিটির সদস্যসচিব ছিলাম এটা ঠিক। তবে কমিটির চেয়ারম্যান বা প্রধান ছিলেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী। তিনিই কাজ কে পাবেন, তা ঠিক করেছেন।’
বিষয়টি নিয়ে ক্লাস ওয়ান ট্রেডার্সের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘ঘুস বেশি পেয়ে অন্যায়ভাবে প্রথম দরপত্র বাতিল করা হয়েছে।’
অন্যদিক তালুকদার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মুরাদ তালুকদার ঘুস দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘দরপত্রে নিয়ম মেনে আমি কাজ পেয়েছি।’
ঘুসগ্রহণের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ
সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে ঘুসগ্রহণের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী। গত ১৮ আগস্ট প্রধান প্রকৌশলীর সই করা এক চিঠিতে বলা হয়, ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে অভিযোগের আবেদনপত্র পাঠানো হলো। প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদন আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো।

আরও পড়ুন

চুক্তির পরও শুরু হয়নি পাঠ্যবই ছাপা, পুনঃদরপত্রে অর্ধশত লট

জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর তা তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর প্রতিবেদনের তথ্য ও মতামত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘অসুস্থ’ জানিয়ে তলবে সাড়া দিচ্ছেন না মনিরুজ্জামান!
১৩ আগস্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়ার পর অসুস্থ জানিয়ে তলবে সাড়া দিচ্ছেন না মনিরুজ্জামান মনি। অভিযোগ তদন্তে তাকে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে ডাকা হলেও তিনি হাজির হননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।
ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের দুজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, যেদিন অভিযোগ জমা পড়েছে, সেদিনই বিষয়টি জেনেছেন মনিরুজ্জামান। এরপর ১৪ ও ১৫ আগস্ট ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ১৬ আগস্ট তিনি রাজধানীর শ্যামলীর এক হাসপাতালে ডেঙ্গু টেস্ট করান। তাতে তার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। একই সঙ্গে তিনি হাসপাতালে ভর্তি বলে জানান। তবে খোঁজ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তলবে সাড়া না দেওয়ার বিষয়ে মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘আমাকে ডাকা হয়েছিল, অসুস্থতার কারণে যেতে পারিনি। সুস্থ হলে যাবো।’
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ নেতা ছিলেন মনিরুজ্জামান, সক্রিয় সিন্ডিকেটে
ঘুসকাণ্ডে আলোচিত মনিরুজ্জামান মনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য ছিলেন। যোগদানের পর থেকেই আওয়ামী লীগ-বলয়ে প্রভাব খাটিয়ে ঘুসবাণিজ্য করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পরও অদৃশ্য কারণে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পান তিনি।

আরও পড়ুন

শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব, বাস্তবায়ন ‘লেজেগোবরে’

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মনিরুজ্জামান যখন ঢাকা মেট্রো সার্কেলে পদায়ন পান, সেসময় সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ইইডি শাখার সদস্যসচিব জাহেদুল করীম। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের এ দুই নেতা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতেন। বিনিময়ে নিতেন বড় অংকের ঘুস। প্রধান কার্যালয়েও তাদের সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী হওয়ায় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দেদারসে পার পেয়ে যেতেন।
অভিযোগ রয়েছে, জাহেদুল করীমের পর ঢাকা মেট্রো সার্কেলে নির্বাহী প্রকৌশলী হন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের আরেক নেতা মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ। তবে আলিফের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন মনিরুজ্জামান মনি। প্রধান কার্যালয়ের দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর আশীর্বাদে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীকে এড়িয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন লেনদেন করতেন।
এসব অভিযোগে সম্প্রতি তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি করা হয়। তবে উল্টো বদলির আদেশ বাতিল করিয়ে ফের ঢাকা মেট্রো অথবা প্রধান কার্যালয়ে ফিরতে মনিরুজ্জামান তদবির করছেন বলে অভিযাগ করেছেন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবো। কেউ ঘুসবাণিজ্য কিংবা অনিয়ম করলে ছাড় দেওয়া হবে না।’
এএএইচ/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট