শিশুদের মনোজগৎ গড়ে তুলতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শিশুতোষ কবিতা, গান ও সাহিত্যচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রনায়ককে শিশুদের মন বুঝতে হবে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। যে রাষ্ট্রনায়কের মাথায় (ভাবনায়) এই ভাবনা থাকে না, তিনি রাজনীতিবিদ হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। নজরুল বর্ষ উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, রবীন্দ্রনাথ অনেক শিশুর জন্য কবিতা ও গান লিখেছেন। ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’—এ ধরনের গান শিশুরা গায়। প্রত্যেক কবি-সাহিত্যিকের নিজস্ব প্রতিভা রয়েছে এবং সাহিত্যজগতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। তবে সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে উচ্চতা, তার সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।
তবে শিশুতোষ রচনার ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় বলে মনে করেন তিনি।
রিজভী বলেন, একজন কবির সঙ্গে আরেকজন কবির তুলনা হয় না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেউ কেউ এগিয়ে যান। শিশুদের জন্য গান, শিশুদের জন্য কবিতা এবং এত প্রাণস্পর্শী কবিতা ও গান নজরুল লিখেছেন, যা তাকে শিশুতোষ রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নজরুলের ‘প্রজাপতি’ গানটির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’— অসাধারণ একটি গান। শিশুদের জন্য লেখা ‘খাদু দাদু’ কবিতায় দাদু বা নানার সঙ্গে নাতি-নাতনির রসিকতার সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ কবিতায় একটি প্রাণীর সঙ্গে ছোট্ট একটি মেয়ের মনের অন্তর থেকে যে কথোপকথন, সেটিও অসাধারণ।
তিনি বলেন, একটি পেয়ারা গাছের মধ্যে একটি কাঠবিড়ালি তাকিয়ে আছে একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের দিকে। তাদের মধ্যে কী ভাবের আদান-প্রদান হচ্ছে, তা জানা নেই। কিন্তু কবি শিশুর মনের মধ্যে ঢুকে সেই ভাবটিই বের করে এনেছেন। মনের গভীরে ঢুকে শিশুর ভাবনা বের করে আনার এই অসাধারণ ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা একজন কবিকে প্রতিভা না দিলে সম্ভব নয়।
ডেনিশ রূপকথার লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, অ্যান্ডারসন বলেছেন- প্রত্যেক মানুষের জীবনই একটি রূপকথা। স্বয়ং ঈশ্বর নিজের আঙুল দিয়ে এই রূপকথা লেখেন। প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের দেওয়া প্রতিভা যেসব শিশুতোষ কবি-সাহিত্যিককে দেওয়া হয়, তারাই মানুষের জীবনীকে রূপকথার মতো করে লিখতে পারেন। বড় কবি-সাহিত্যিকরাই শিশুদের মন পাঠ করতে পারেন, অধ্যয়ন করতে পারেন এবং তাদের মনের ভাব বুঝতে পারেন।
অ্যান্ডারসনের আরেকটি বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, শব্দ যেখানে ব্যর্থ হয়, সংগীত সেখানে সফল হয়। গল্প, কবিতা অনেক কিছুই লেখা হয়। কিন্তু সেটি যদি সুরের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ না করে, মনকে ছুঁয়ে না যায়, তাহলে তার কোনো দাম থাকে না। শব্দ দিয়ে গদ্য লেখা ব্যর্থ হলেও সংগীত সেটিকে বাঁচিয়ে রাখে।
আরও পড়ুন
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার বিএনপির যৌথসভা
নজরুল সেই প্রচেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তার শিশুতোষ সংগীত এখনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
এবার ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’-এর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে বর্ষ ঘোষণা করেছেন, সেটি হচ্ছে নজরুল বর্ষ। তার পিতার রেখে যাওয়া কাজ বা শুরু করা কাজ তিনি আত্মস্থ করেছেন। নতুন করে ক্রীড়া আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বিভিন্ন জেলায় নতুন করে স্পোর্টস হবে। শিশুদের খেলাধুলার দিকে নেওয়া এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিশ্চিত করার কাজের সূচনা করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তার পিতার মতো।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, রাষ্ট্রনায়কের হৃদয়জুড়ে থাকে মানব প্রজন্মের প্রাথমিক অবস্থা। সেই প্রাথমিক অবস্থা হচ্ছে শিশু-কিশোর। এরপর তারা পূর্ণতা পায়, যৌবনে যায়, যুবক হয়, প্রৌঢ় হয় এবং বয়স বাড়তে থাকে। কিন্তু প্রথমে গড়ে তোলার প্রধান সময়টি হচ্ছে শিশু-কিশোরদের সময়। তাদের গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, এই ভাবনাটা যে রাষ্ট্রনায়কের মাথায় থাকে না, সে রাষ্ট্রনায়ক— একটা রাজনীতিবিদ হতে পারেন, সস্তা ধরনের রাজনীতিবিদ হতে পারেন। তিনি রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না।
শিশুদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে রিজভী বলেন, রাষ্ট্রনায়ককে অবশ্যই শিশুদের মন বুঝতে হবে। তাদের গড়ে তুলতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দান করতে হবে, যেন সারা বাংলাদেশে তারা সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে।
সমাজে অপরাধ ও মাদকের প্রভাবের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে ভয়াবহ ঘটনা দেখা যায়। মাদকের প্রভাবে রংপুরে একজন স্কুলশিক্ষককে তার পরিবারের চার সদস্যসহ এক মাদকসেবী হত্যা করেছে। এটি নির্মম ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতি। মাদকসেবীদের কোনো কাণ্ডজ্ঞান থাকে না।
সমাজের অপরাধপ্রবণতা ও মাদকের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে নজরুলচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের জন্য লেখা নজরুলের কবিতা, গল্প ও গান বেশি করে চর্চা করতে হবে।
নজরুলের ‘চল চল চল’ কবিতার প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’—এই রণসংগীত মার্চপাস্ট বা কুচকাওয়াজে বাজলে মনে হয়, তিনিও সেখানে শরিক হন।
তিনি বলেন, নজরুলের কবিতার মধ্যে অনেক বাণী রয়েছে। ‘কবে খোয়ালী বাদশাহী, সেই অতীতে আজও চাই’— এই চিন্তার মাধ্যমে অতীতে মুসলমানদের বাদশাহী ছিল, আমরা রাজা ছিলাম— এই ধারণায় অবশ হয়ে থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অথচ পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। ‘চল চল চল’ কবিতার মাধ্যমে নজরুল সেই বিষয়ে সচেতন করেছেন।
রিজভী বলেন, এ বছর নজরুলের বছর। আমরা প্রতিটি ক্ষণে তাকে মনে করবো, তার গান গাইবো। তার গান আমাদের মনকে পরিশুদ্ধ করে, যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নির্মল আনন্দ দেয়।
আরও পড়ুন
এনসিপি সুযোগের অভাবে সৎ, অপকর্মে জামায়াত-শিবির: রাশেদ খাঁন
শিশুদের জন্য লেখা নজরুলের কবিতা ও গান শিশুদের উৎসাহী, উদ্যোগী ও উদ্যমী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নজরুলের বিজ্ঞানচেতনার কথাও তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ‘থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে’— এই ধরনের লেখার মাধ্যমে মাটির গভীরে পাওয়া ধাতু দিয়ে কীভাবে নানান জিনিস তৈরি করা হচ্ছে, সে বিষয়ও তিনি তুলে ধরেছেন। প্রায় ১০০ বছর আগে তিনি এসব লিখেছেন। অর্থাৎ শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে, এগিয়ে যাওয়ার দিকে ধাবিত করতে চেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে’ কবিতাটি স্কুলে পড়ার সময়, পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েছেন। নজরুলের প্রত্যেকটি কবিতাই এগিয়ে যাওয়ার, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা করার এবং বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার কথা বলে।
রিজভী বলেন, একজন কালের কবি যদি কালের প্রতিনিধিত্ব না করেন, তাহলে তিনি বড় কবি নন। সেই সময় চেয়েছিলেন মানুষ এগিয়ে যাবে, যুক্তিশীল হবে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে চলবে। কবি যখন এসব তুলে ধরেন, তার কবিতা ও গানের কারণে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয় এবং জ্ঞানচর্চা করে।
নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজও নজরুল খুবই প্রাসঙ্গিক। আজও ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়, ফ্যাসিবাদ নিষ্ঠুরতা করে। নিজ দেশের ফ্যাসিবাদী শাসকেরা নিজ দেশের লোকদের গুম করে, হত্যা করে, রক্ত ঝরায়। এ কারণেই নজরুল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেন, যখন অত্যাচার থাকে না, তখন নজরুল তার প্রেমের গান এবং ঈশ্বরের কাছে নিবেদনমূলক গান দিয়ে মানুষকে নির্মল আনন্দে উদ্বুদ্ধ করেন। শিশু-কিশোর, আলোকপিয়াসী বাচ্চাদেরও তিনি উদ্বুদ্ধ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার সাফল্য কামনা করেন রিজভী। শিল্পকলা একাডেমির কর্মসূচির প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা যেভাবে নজরুলকে তুলে ধরেছে এবং শিল্পকলা একাডেমির যত কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেগুলো খুবই প্রাণচঞ্চল্য তৈরি করেছে। নজরুল আরও বেশি করে মানুষের সামনে প্রস্ফুটিত হবেন এবং নজরুলচর্চা আরও বাড়বে।
নজরুল বর্ষে নজরুলের কর্মসূচিতে শিশু-কিশোরদের জন্য একটি জায়গা রাখার আহ্বান জানান রিজভী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক চিত্রনায়ক উজ্জ্বল, রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ অনেকে।
কেএইচ/কেএসআর







