বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | সময়: দুপুর ২:২৪

বিচার বিভাগ এখন অনেক বেশি স্বাধীন পরিবেশে কাজ করতে পারছে

বিএনপি সরকারের আমলে বিচার বিভাগ এখন অনেক বেশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশে কাজ করতে পারছে। স্বাধীনভাবে বিচারকাজ করছেন বিচারকরা, আইনজীবীরাও পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম প্রসঙ্গে কথাগুলো বলেন ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী। 
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক।
জাগো নিউজ: একজন পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগের সার্বিক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: আমার দৃষ্টিতে গত ছয় মাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বিচার বিভাগ এখন অনেক বেশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশে কাজ করতে পারছে। আগে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, হয়রানিমূলক মামলা এবং নানান ধরনের চাপের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন ছিল। এখন বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচারকাজ করছেন, আইনজীবীরাও পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
সরকারের পক্ষ থেকেও আদালত বা বিচারকদের ওপর কোনো ধরনের খবরদারি নেই। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আদালত এখন রাজনৈতিক বা মিথ্যা মামলার চাপে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে প্রকৃত মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় মনোযোগ দিতে পারছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একদিনে পুরোপুরি বদলে যাবে না। দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
জাগো নিউজ: আগের সময়ের তুলনায় গত ছয় মাসে বিচার বিভাগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোনটা দেখেছেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: আমার কাছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সততা ও দায়িত্বশীলতার যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ- এসব বিষয়ও মানুষের কাছে একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। ওপরের স্তরে যদি সততা ও নিষ্ঠা থাকে, তাহলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে নিচের স্তরেও পড়ে। একটি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে পরিবর্তন করা কঠিন, কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব।
জাগো নিউজ: সরকারের আইন ও বিচারসংক্রান্ত কার্যক্রমের মধ্যে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি মনে করি। বিচারক যদি স্বাধীনভাবে বিচার করতে না পারেন, প্রসিকিউশন যদি পেশাগতভাবে কাজ করতে না পারে এবং আইনজীবীরা যদি কোনো চাপের মধ্যে থাকেন, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিচার বিভাগে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিচারক ও আইনজীবীরা নিজেদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারের কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া চলা-এটি একটি বড় অর্জন।
জাগো নিউজ: রাজনৈতিক মামলা বা হয়রানিমূলক মামলা চিহ্নিত করা এবং এ ধরনের মামলার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
ওমর ফারুক ফারুকী: এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক সরকারের সময়ে কোনো মামলা ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, আবার সরকার পরিবর্তনের পর সেটিকেই রাজনৈতিক মামলা বলা হতে পারে- এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। এজন্য তদন্তের মান বাড়াতে হবে। মামলা দায়েরের ক্ষেত্রেও আইনগত ভিত্তি ও প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আইনকে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।

আরও পড়ুন

পিপি ওমর ফারুক / সাক্ষীদের জবানবন্দিতেই পল্লবীর শিশু হত্যা মামলার মূল তথ্য উঠে এসেছে

একটি মামলা সত্য হলে সরকারকে- সেটি বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। আবার কোনো মামলা যদি হয়রানিমূলক হয়, তাহলে সেটিও দ্রুত শনাক্ত করে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া তথ্য-প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হলেই এই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া সম্ভব।
জাগো নিউজ: দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা কোথায়?
ওমর ফারুক ফারুকী: দীর্ঘসূত্রতার পেছনে একাধিক কারণ থাকে। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, সময়মতো সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়া, তদন্ত কর্মকর্তার বদলি, ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত জটিলতা- এসব কারণে মামলা দীর্ঘায়িত হয়। শুধু আদালতকে দায়ী করলে হবে না। তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া- এই তিনটি অংশকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। একটি মামলা দ্রুত শেষ করতে হলে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে শুরু করে সাক্ষ্য, আলামত, ফরেনসিক প্রমাণ এবং আদালতের কার্যক্রম- সব জায়গায় পেশাদারত্ব ও সমন্বয় প্রয়োজন।
জাগো নিউজ: দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে গত ছয় মাসে কোনো ইতিবাচক উদাহরণ দেখছেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: কিছু মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। যেমন সম্প্রতি মিরপুরের পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত একটি মামলার বিচার নিম্ন আদালতে তুলনামূলকভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সমন্বয় থাকলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তবে দ্রুত বিচার মানেই শুধু দ্রুত রায় নয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন সাজা না পান এবং প্রকৃত অপরাধী যেন শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারেন- এই ভারসাম্য বজায় রেখেই বিচার দ্রুত করতে হবে।
জাগো নিউজ: রাজধানীতে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের মধ্যে কোন বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের?
ওমর ফারুক ফারুকী: সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি নির্ভয়ে চলাফেরা করতে না পারে, তাহলে উন্নয়ন বা সংস্কারের সুফলও পুরোপুরি অনুভব করা যায় না। ছিনতাই, চুরি, রাহাজানি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে যারা এসব অপরাধে জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াও কার্যকর হতে হবে।
আদালতও জামিনের বিষয়টি আইন অনুযায়ী বিবেচনা করে। বিশেষ করে কোনো আসামি জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে সেই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
জাগো নিউজ: রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ কি এখনো আদালতে আসছে?
ওমর ফারুক ফারুকী: আমাদের সমাজে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। সরকার পরিবর্তন হলেই এ প্রবণতা একদিনে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে- এমনটি বলা বাস্তবসম্মত নয়। তবে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ হবে এবং আদালত আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবেন। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যক্তির দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না।
জাগো নিউজ: চাঁদাবাজি ও দখলদারির মতো মামলায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?
ওমর ফারুক ফারুকী: এটি নিশ্চিত করতে হলে তদন্তের পেশাদারত্ব সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত কর্মকর্তা যদি নিরপেক্ষভাবে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন এবং প্রসিকিউশনও আইনের ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করে, তাহলে রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ অনেক কমে আসে। একটি মামলায় কে কোন দলের বা কার ঘনিষ্ঠ- এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার বিরুদ্ধে কী তথ্য-প্রমাণ আছে। এই নীতিটিই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আদালতের কাজও হলো তথ্য-প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে বিচার করা।
জাগো নিউজ: বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
ওমর ফারুক ফারুকী: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই স্বাধীনতাকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। শুধু একটি সরকারের সদিচ্ছার ওপর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সেটি টেকসই হবে না। বিচার বিভাগ, তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশন- প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যেন সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন থাকে। আইনের শাসন ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর হওয়া উচিত।
জাগো নিউজ: প্রসিকিউশন ব্যবস্থা আরও পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
ওমর ফারুক ফারুকী: পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও দক্ষতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রসিকিউশন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন প্রসিকিউটর রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। তাই এখানে দক্ষ ও সৎ মানুষ প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ, আধুনিক আইন সম্পর্কে ধারণা, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাগো নিউজ: পিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাগত যোগ্যতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
ওমর ফারুক ফারুকী: আমার মতে, পেশাগত যোগ্যতাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। একজন আইনজীবীর অভিজ্ঞতা, আইনি জ্ঞান, সততা, মামলার প্রস্তুতি ও আদালতে দক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রসিকিউশন আরও শক্তিশালী হবে। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু কোনো পরিচয় নয়, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও পেশাগত মানকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি এখাতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতেও সরকারের আন্তরিকতার কথা আমরা জানি।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রের হয়ে লড়ে টিকে থাকা দায়, ৬ মাসেও বিল পান না আইনজীবীরা

জাগো নিউজ: জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
ওমর ফারুক ফারুকী: এই মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আদালতে ৬০টিরও বেশি মামলা প্রক্রিয়াধীন। এসব মামলায় তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত অপরাধী, সরাসরি অংশগ্রহণকারী, পরিকল্পনাকারী এবং সহায়তাকারীদের ভূমিকা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। এখানে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। কারণ সরকার ও রাষ্ট্র- কেউই চায় না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হোক। আবার প্রকৃত অপরাধীরাও যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য তথ্য-প্রমাণ, ভিডিও, আলামত, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য উপাদান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
জাগো নিউজ: এসব মামলায় নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করতে কী করা দরকার?
ওমর ফারুক ফারুকী: সঠিক ও পেশাদার তদন্তই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যাবে না। প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা। সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং অন্যভাবে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকার পার্থক্যও নির্ধারণ করতে হবে। বিচারের মূলনীতি হলো- নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তি না পান এবং অপরাধীও যেন পার না পেয়ে যায়। এই দুই বিষয় নিশ্চিত করেই তদন্ত ও বিচার এগিয়ে নিতে হবে।
জাগো নিউজ: সাক্ষী সুরক্ষা, ফরেনসিক তদন্ত ও ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনায় কোন জায়গাগুলোতে সংস্কার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
ওমর ফারুক ফারুকী: আধুনিক অপরাধের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শুধু প্রচলিত সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করলে অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয় না। ডিজিটাল প্রমাণ, ভিডিও, মোবাইল ডেটা এবং ফরেনসিক আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই তদন্তকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ফরেনসিক রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাক্ষীরা যেন ভয়ভীতি বা চাপ ছাড়া আদালতে সত্য কথা বলতে পারেন, সেই পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করেও সেই মানের সম্মানি পাই না

জাগো নিউজ: আগামী ছয় মাসে সরকারকে আইন ও বিচার খাতে কোন তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেবেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: প্রথমত, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ছিনতাই, রাহাজানি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, বিচার বিভাগ, তদন্ত ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও পেশাদার করতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও যেন বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন থাকে, সেই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
জাগো নিউজ: একজন রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসকে ১০’র মধ্যে কত নম্বর দেবেন?
ওমর ফারুক ফারুকী: আমি বিষয়টি নির্দিষ্ট কোনো নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করতে চাই না। কারণ একটি সরকারকে শুধু ছয় মাসের কিছু ঘটনা দিয়ে বিচার করাও সবসময় সহজ নয়। তবে এটুকু বলতে পারি, সরকার একটি কঠিন পরিস্থিতি ও বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই উদ্যোগগুলো টেকসই করা। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে যদি জননিরাপত্তা আরও নিশ্চিত করা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর বিচার এগিয়ে যায়, তাহলে মানুষ আরও বড় সুফল পাবে বলে আমি আশা করি।
এমডিএএ/এমআরএম/ এমএফএ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ
লর্ডসে ফিরছেন বাবর

হেডিংলেতে ইংল্যান্ডের কাছে লজ্জাজনক হারের পর পাকিস্তান শিবিরে এবার স্বস্তির