ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী। উদ্যাপনের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ নাট্য প্রযোজনার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরাম। জোর প্রস্তুতি চলছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’ মঞ্চে আনছেন তারা।
২০ আগস্ট এবং পরদিন ২১ আগস্ট ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে পর পর দুটি শো হবে ‘রক্তকরবী’র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রম বিভাগ ও ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরামের যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হচ্ছে নাটক।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড অব স্টুডেন্ট লাইফ তাহসিনা রহমান বলেন, ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বার্ষিক নাট্য প্রযোজনায় “রক্তকরবী” একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টি “রক্তকরবী” অবলম্বনে এটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ নাট্য প্রযোজনার উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রযোজনা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রতিভা, নিষ্ঠা ও দলগত কাজের এক অসাধারণ প্রকাশ। রজতজয়ন্তীর এই প্রযোজনা কেবল একটি নাট্য পরিবেশনা নয়, এটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদ্যাপন।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরামের প্রেসিডেন্ট রায়া নওশীন মাহপারা বলেন, ‘২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরাম। সেই থেকে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নাট্যচর্চায় সম্পৃক্ত করা। একই সঙ্গে তাদের বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখা।’
‘রক্তকরবী’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রক্তকরবী শুধু একটি নাটক নয়, এটি আমাদের শিল্পী, কলাকুশলী, সদস্য এবং সহযোগীদের সম্মিলিত শ্রম, সময়, আবেগ ও ভালোবাসা।’
এদিকে প্রযোজনাটির নির্দেশক শ্রেয়শ্রী সরকার বলেন, ‘রক্তকরবী আমার কাছে কেবল একটি নাটক নয়; এটি মানুষ, ক্ষমতা এবং মুক্তির অনন্ত অনুসন্ধানের এক নাট্যভাষা। সময়ের সঙ্গে শোষণের রূপ বদলায়, ক্ষমতার মুখোশ বদলায়, কিন্তু মানুষের স্বাধীন সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা একই থাকে। তাই এই নাটক আজও আমাদের সময়কে গভীরভাবে প্রশ্ন করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রযোজনায় “রক্তকরবী”কে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে নয়, সমকালীন বাস্তবতার আলোকে পুনরায় পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে। উন্নয়নের ভাষ্য, ভোগবাদ, অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার ভেতর আমরা যক্ষপুরীকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।’
তাদের কাছে যক্ষপুরী কোনো দূরবর্তী কল্পলোক নয়, বরং এই সমাজেরই একটি প্রতীক। এই ভাবনাকে প্রকাশ করতে শরীর, কোরাস, সংগীত, আলো, প্রতীকী দৃশ্যবিন্যাস এবং সমকালীন মঞ্চভাষাকে একত্র করেছে দলটি। উদ্দেশ্য, রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক করে তোলা? না, বরং তার চিন্তার সঙ্গে এখনকার সময়ের একটি সৃজনশীল সংলাপ নির্মাণ। তারা সফল হয় কি না তা বলতে পারবেন দুদিনের শো দেখা দর্শক।
নাটকের কাহিনিতে দেখা যাবে যক্ষপুরীর সোনালোভী ও শোষণনির্ভর সমাজব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ায় জীবন, প্রেম ও মুক্তির শক্তি। রহস্যময় রাজা, ক্ষমতালোভী সর্দারদের শাসন এবং যন্ত্রের মতো বন্দী মানুষের জীবনে নন্দিনীর আগমন যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। তার মুক্তচেতা উপস্থিতি মানুষকে ভয় ভেঙে নিজের অস্তিত্ব চিনতে শেখায়।
রঞ্জনের স্বাধীনচেতা মন ও নন্দিনীর অদম্য জীবনবোধ যক্ষপুরীর কঠোর শৃঙ্খলকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ক্ষমতা ও শোষণকে অতিক্রম করে মানবমুক্তি ও জীবনের জয়গানই হয়ে ওঠে নাটকটির মূল সুর।
ফোরামের উপদেষ্টা ড. মাহফুজা হিলালী বলেন, ‘রক্তকরবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিনিধিত্বশীল নাটক। এ নাটক আজও প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশ যেন একেকটি যক্ষপুরীতে পরিণত হয়েছে। আর সাধারণ মানুষ পরিণত হয়েছে শাসকের “ছিবড়ায়”। তাদের ভেতরে প্রাণ নেই, কেবল মেশিনের মতো কাজ করে চলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এদের ভেতরে প্রাণসঞ্চার করতে আবারও নন্দিনীকে প্রয়োজন। নন্দিনী শুভশক্তির প্রতীক। কল্যাণের পথে তার যাত্রা। সে আত্মার মুক্তি ঘটায়। সুতরাং যন্ত্রসভ্যতার করাল থাবায় নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির জন্য আরেকবার “রক্তকরবী”র মালা চূড়ায় পরতে হবে।’
নাটককে সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম উল্লেখ করে ড. মাহফুজা হিলালী বলেন, ‘আমরা নাটকের মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় তথা বিশ্ব-পরিমণ্ডলে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সুস্থ ধারা প্রবাহিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। থিয়েটার ফোরামের এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক।’
আয়োজকদের প্রত্যাশা, রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সৃষ্টি ‘রক্তকরবী’র এই মঞ্চায়ন শুধু দর্শকদের বিনোদন দেবে না, বরং সমকালীন সমাজ, ক্ষমতা, শোষণ ও মানুষের স্বাধীন সত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করবে।
এমআই/আরএমডি







