মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬ | সময়: দুপুর ১২:৫৮

বাড়তি বাউন্স ও মুভমেন্টেই যত সমস্যা টাইগারদের

ডারউইনে অনিন্দ্য সুন্দর টিম পারফরম্যান্স। ৪ দিনের ১১ সেশনের ৯টিতে অসিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ের পর ম্যাকাইতে পৌনে ২ দিনে ইনিংস পরাজয়। এটা কি অসহায় আত্মসমর্পণ? নাকি বাড়তি গতি, বাউন্স আর মুভমেন্টে টাইগারদের সামর্থ্যের সত্যিকার চিত্র? তা নিয়েই চলছে আলোচনা, পর্যালোচনা, বিতর্ক।
সন্দেহ নেই, ডারউইনে দারুণ পরিপাটি ক্রিকেট উপহার দিয়েছে শান্তর দল। বোলিং ও ব্যাটিং দুটিই ভালো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বসেরা দলের সঙ্গে তাদেরই মাটিতে যতটা ভালো খেলা যায়- তানজিদ তামিম, নাজমুল শান্ত, মেহেদি মিরাজ, মুমিনুল, হাসান মাহমুদরা তাই খেলেছেন। তাদের চোখধাঁধানো নৈপুণ্য আর কার্যকর পারফরম্যান্সের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় প্যাট কামিন্সের দুরন্ত অসি বাহিনী।
কিন্তু ম্যাকাইতে এসে সেই বাংলাদেশ দলের ভিন্ন রূপ। একেবারে পাদপ্রদীপের আলো থেকে অন্ধকারে। অমন ভালো খেলার পর কেন এই ব্যর্থতা, বিপর্যয়?
ডারউইনে টাইগাররা যে সুন্দর, সাবলীল পারফরম্যান্স করেছেন, সেটার যতই প্রশংসা করা হোক না কেন, কম হবে। যত বিশেষণই প্রয়োগ করা হোক না কেন, পরিপূর্ণ হবে না। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চারদিন প্রায় ৯০ শতাংশ সেশনে কর্তৃত্ব, প্রভাব খাটিয়ে অনায়াস জয়ের স্বাদ পাওয়া সহজ নয়। শান্তর দল ডারউইনে সেটাই করে দেখিয়েছে। কিন্তু ম্যাকাইতে সেই দলই কেমন চুপসে গেল! কেন এমন হলো?
তবে কি ডারউইনের ‘ড্রপ ইন’ পিচই ছিল টাইগারদের অনুকূল ক্ষেত্র? এ প্রতিবেদনে আমরা তারই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি।
শুনতে কানে লাগলেও বলতে হয়, ডারউইনের উইকেটটি বাংলাদেশের ভালো খেলায় বিশেষ সহায়ক ছিল। এই ধরনের পিচে বাংলাদেশ সব সময়ই ভালো খেলে। আর ম্যাকাইতে যে ফাস্ট, বাউন্সি আর সুইংযুক্ত উইকেটে খেলা হয়েছে, সেই পিচে বাংলাদেশের ট্র্যাক রেকর্ড কোনো সময়ই খুব ভালো না।
বেশি দূরে ফিরে যেতে হবে না। ইতিহাস জানাচ্ছে, গত জুনের শেষ ভাগে হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে দুর্বল, কমজোরি, জীর্ণ-শীর্ণ ও তলানিতে পড়ে যাওয়া জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ও ৮৫ রানে পরাজিত হয়েছিল নাজমুল হোসেন শান্তর বাংলাদেশ।
এবার অস্ট্রেলিয়ায় ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে ডারউইনে প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটের দুর্দান্ত জয়। তারপর ম্যাকাইতে গিয়ে আবার ইনিংস পরাজয়ের লজ্জায় ডোবা। এবার আরও করুণভাবে দুদিনেরও কম সময়ে এবং দুই ইনিংসেই ১০০-এর নিচে (৬৪ ও ৯৫) অলআউট।
শুধু পরিণতিরই অদ্ভুত মিল নয়। কথাবার্তায়ও আছে দারুণ সাযুজ্য। জুনের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের ৪১০ রানের জবাবে জিম্বাবুইয়ান ফাস্ট বোলার মুজারাবানি, নিওম্যান নিয়ামহুরিদের বাড়তি বাউন্স ও সুইংয়ের মুখে প্রথম ইনিংসে ১৪০ আর পরের বার ১৮৫-তে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ইনিংস।
ওই টেস্ট শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত যা বলেছিলেন, এবার মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার ২১০ রান দুবার ব্যাট করেও অতিক্রম করতে না পেরেও টাইগার ক্যাপ্টেন শান্ত ঘুরেফিরে সেই বাড়তি গতি, বাউন্স আর মুভমেন্টের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারাকেই পরাজয়ের কারণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
আসলে এটাই শেষ কথা। তা হলো, বাড়তি বাউন্স আর মুভমেন্টের সামনে রীতিমতো অসহায় বাংলাদেশের ব্যাটাররা। বাংলাদেশের ব্যাটাররা সব সময় মাঝারি গতি, মাঝারি বাউন্স ও কম মুভমেন্টে ভালো খেলেন। যে পিচে বল পড়ে বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে কাঁধ, মুখ, মাথার আশপাশে ওঠে না, সুইং, লেট সুইং তেমন হয় না, সেই পিচে টাইগারদের ব্যাট কথা বলে। হাসে। তারা অস্বস্তিবোধ করেন না। নিজের মতো করে খেলেন।
চার প্রতিষ্ঠিত ব্যাটার- ওপেনার তানজিদ তামিম (১০১), অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত (৮৪), মেহেদি হাসান মিরাজ (৬৫), মুমিনুল হক (৪৯)- স্বচ্ছন্দে খেলে রান করেছেন। মুশফিকুর রহিম, তাসকিন, হাসান মাহমুদ আর তাইজুলও অনেকটা সময় উইকেটে টিকে ছিলেন।
তাদের ব্যাটিং নৈপুণ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েই বলতে হয়, ডারউইনের উইকেট তুলনামূলক নিষ্প্রাণ ছিল বলেই জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক আর নাথান লায়নের সাজানো বিশ্বের সেরা বোলিং শক্তির বিপক্ষে ১৩৮ ওভার ব্যাটিং করে ৪২৬ রানের বড়সড় পুঁজি গড়তে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
ব্যাটিংটা আগের মতো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী না হলেও তিন ফাস্ট বোলার জশ হ্যাজেলউড, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স আর অফস্পিনার নাথান লিয়নের গড়া অস্ট্রেলিয়ার বোলিংটা এখনো টেস্টে সবার সেরা। বিশ্বে এক নম্বর।
অনেক গুণে গুণান্বিত অসি চার বোলার বাংলাদেশের বিপক্ষে ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে নামার আগেই ১৬০০+ উইকেটশিকারি। এই সিরিজ শেষে অসি চার বোলার মিচেল স্টার্ক (১০৭ টেস্টে ৪৪৫ উইকেট), জশ হ্যাজেলউড (৭৮ টেস্টে ৩০৩ উইকেট), প্যাট কামিন্স (৭৪ টেস্টে ৩২২) আর নাথান লিয়নের (১৪৩ টেস্টে ৫৭১ উইকেট) সর্বমোট উইকেট সংখ্যা ১৬৪১।
এমন বোলারদের বিপক্ষে ফাস্ট, বাউন্সি ও বাড়তি ম্যুভমেন্টে খেলার মতো নিখুঁত টেকনিক, দারুণ টেম্পারামেন্ট, বল ছাড়া, ডিফেন্স করা এবং ধৈর্য ধরে আলগা বলের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে ইনিংস সাজানোর ক্ষমতা এখনো অনেক কম বাংলাদেশের ব্যাটারদের।
ম্যাকাই টেস্টে বারবার এ সত্যই ফুটে উঠেছে। জিততে মরিয়া অসি ফাস্টবোলাররা ঠান্ডা আবহাওয়া, বাতাস আর বাড়তি বাউন্স ও মুভমেন্ট পেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। তাদের দ্রুতগতির ডেলিভারি, বাড়তি বাউন্স আর সুইংয়ের মুখে সাদমান, তানজিদ তামিম, মুমিনুল হক, নাজমুল শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস আর মেহেদি হাসান মিরাজদের রীতিমতো বেসামাল মনে হয়েছে।
ওই তিন হাই কোয়ালিটি ফাস্টবোলার অনুকূল কন্ডিশন পেয়ে বল হাতে আগুন ঝরিয়েছেন। বাঁ-হাতি মিচেল স্টার্ক, তার ন্যাচারাল ‘অ্যাঙ্গুলার ডেলিভারি’ ছাড়াও ডানহাতিদের জন্য কখনো কখনো ভেতরে বল ঢুকিয়েছেন। স্টার্ক দুদিকে সুইং করানোয় বাংলাদেশের ব্যাটাররা বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছেন।
সাদমান, মুমিনুল, তানজিদ তামিমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি কোন বলটা বেরিয়ে যাবে, কোনটা ভেতরে ঢুকবে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে ছাড়ব না, ঠেকাব- ভেবে ভেবে ব্যাট পেতে দিয়ে উইকেট দিয়ে এসেছেন।
কামিন্স আর হ্যাজেলউডও ফাস্টবোলিং সহায়ক পিচে দ্রুতগতিতে বল করেছেন। তাদের বলেও বারুদ ঝরেছে। এমন আগুন বোলিংয়ের বিপক্ষে ঠিক কী করবেন? কোন কৌশল অবলম্বন করবেন? কোনটা ছাড়বেন, কোনটা ডিফেন্স করবেন, আর কোন ডেলিভারির বিপক্ষে শট খেলবেন- বুঝে উঠতেই সমস্যা হয়েছে টাইগার ব্যাটারদের।
এআরবি/আইএইচএস/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট