ক্রিকেটের পরিভাষায় একটা কথা প্রচলিত আছে-‘ব্যাড টস টু লুজ।’ আজ ম্যাকাইয়ের টস হারটিকে আপনি তা-ই বলতে পারেন। অনেকে বলছেনও তাই।
ম্যাকাই টেস্টে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামার পর অসি বোলারদের তোপে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। জবাবে ৮ উইকেটে ১৬৮ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া। অর্থাৎ প্রথম দিন শেষে নাজমুল হোসেন শান্তর দল ১০১ রানে পিছিয়ে। এই পিছিয়ে থাকাটা শেষ পর্যন্ত কত রানে হয়, সেটার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভাগ্য।
ডারউইনে পরে ব্যাট করে ৪২৬ রান করা দল এবার ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারিনায় টস হেরে প্রথম ব্যাটিংয়ে নেমে ১০০-ও করতে পারেনি। শেষ দিকের ব্যাটার মানে বোলার শরিফুল-তাসকিনদের হাত ধরে কোনোরকমে পঞ্চাশ পেরিয়ে থেমেছে টাইগাররা।
প্রথম টেস্টে যে দল দেড়দিন উইকেটে থেকে ১৩৮ ওভার ব্যাট করে চারশোর বেশি রান করেছিল, সেই দল দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিন মাত্র ২ ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে ৩৪ ওভারে অলআউট! খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়ার উপক্রম।
তবে কঠিন সত্য হলো, মাত্র আড়াই ঘণ্টায় ওই ছোট্ট পুঁজিতে প্রথম ইনিংস শেষ করেই সর্বস্বান্ত হয়ে যায়নি টাইগাররা। আমরা ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়েছি-এমন ভাবনায় আচ্ছন্ন না হয়ে ভয়ডর না পেয়ে উল্টো অসিদের ওপর প্রবল বেগে আক্রমণ শানিয়েছে সফরকারী দল। ৪০ ওভারেই অস্ট্রেলিয়ার ৮ উইকেটের পতন ঘটিয়েছেন (১৬৫ রানে) টাইগার বোলাররা।
দুর্দান্ত সুইং আদায় করেন শরিফুল ইসলাম
ম্যাকাইয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া, বাড়তি বাতাস ও পেস বোলিং সহায়ক পরিবেশে নিখুঁত লাইন-লেন্থের সঙ্গে দুর্দান্ত সুইং আদায় করে অসি ব্যাটারদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন শরিফুল ইসলাম।
সকালে অসি বাঁহাতি ফাস্টবোলার মিচেল স্টার্কের বোলিং তাণ্ডের যথাযথ জবাব দিতে না পেরে চটজলদি আউট হয়ে দলকে চরম বিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছেন বাংলাদেশের টপ ও মিডল অর্ডার।
পরের সেশনে বাংলাদেশের একমাত্র বাঁহাতি পেসার শরিফুলও প্রচণ্ড গতির সঙ্গে দুইদিকে সুইং করিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রন্টলাইন ও মিডল অর্ডার ব্যাটারদের কাছ থেকে সর্বাধিক সমীহ আদায়ের পাশাপাশি ৬ উইকেটের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ধরে রেখেছেন।
শরিফুলের বলে আউট হয়েছেন ৬ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, বিউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক।
তাই দিন শেষে অনেকেরই আফসোস-ইস্, এ ম্যাচে যদি নাজমুল হোসেন শান্ত টস জিততেন! তাহলে শরিফুলের এই বিধ্বংসী বোলিংয়ের মুখে হয়তো দেড়শোর আশপাশে শেষ হতো অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস। পরের দৃশ্যপটও হয়তো ভিন্ন হতে পারতো।
ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারিনার উইকেটের যে অবস্থা, তাতে ফাস্টবোলাররা জায়গামতো বল ফেলতে পারলে তাদের স্বচ্ছন্দে খেলা কঠিন। এটা ডারউইনের ‘ড্রপ ইন’ পিচ না। বল পিচ পড়ে স্লথ আসে না। পূর্ণ গতিতে আসে ব্যাটে। সুইংও আছে অনেক বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লেট সুইং হচ্ছে। ব্যাটারের ব্যাটের খুব কাছে গিয়ে সুইংটা হচ্ছে। যে কারণে পিচ পড়ার পর ঠিক কতটা সুইং করবে, তা ঠাউর করে ওঠা কঠিন হচ্ছে।
এবাদতকে সরিয়ে বাঁহাতি পেসার শরিফুলকে খেলিয়েছে টিম ম্যানেজম্যান্ট
দুই দলের ২ জন বাঁহাতি ফাস্টবোলার মিচেল স্টার্ক আর শরিফুল ইসলাম এই পিচের সর্বোত্তম ফায়দা লুটেছেন। তাদের বাড়তি সুইংয়ে দুদলের ব্যাটাররা সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি ভোগ করেছেন। অকাতরে উইকেটও দিয়ে এসেছেন। সারা দিনে দুই দলের যে ১৮ উইকেটের পতন ঘটেছে, তার ১২ উইকেট জমা পড়েছে স্টার্ক (৬/১২) আর শরিফুলের (৬/৩৫) ঝুলিতেই।
অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্কের ওই লেট সুইংয়ে বাংলাদেশের শুরুর দিকে সাদমান ইসলাম (তৃতীয় স্লিপে), তানজিদ হাসান (থার্ড স্লিপে), মুমিনুল ইসলামরা (গালিতে) ব্যাট পেতে উইকেটের পেছনে স্লিপ ও গালিতে ওত পেতে থাকা অসি ফিল্ডারদের হাতে ধরা খেয়েছেন।
একইভাবে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার শরিফুলের ন্যাচারাল অ্যাঙ্গুলার (কৌণিক ডেলিভারি) ডেলিভারির সঙ্গে কিছু ডেলিভারি চকিতে বিপজ্জনকভাবে বাইরে না বেরিয়ে সুইং করে ভিতরে ঢোকায় খেলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, বিউ ওয়েবস্টাররা।
টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচ, ক্যাপ্টেন ও নির্বাচকরা কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন। তারা উইকেটের চরিত্র ও প্রকৃতি বুঝেই এ ম্যাচে ডানহাতি এবাদত হোসেনকে সরিয়ে বাঁহাতি ফাস্টবোলার শরিফুলকে খেলিয়েছেন। এবাদত ডারউইনের নিষ্প্রাণ পিচে দুর্দান্ত বল করেননি। উইকেটও পেয়েছেন কয়েকটি (তিনটি)। কিন্তু ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারিনার পিচ অনেক বেশি সজীব। প্রাণবন্ত। এখানে সুইং হবে বেশি। এ পিচে শরিফুলের কার্যকারিতার সম্ভাবনা থাকবে বেশি।
এছাড়া তিন ডানহাতি পেসারের মধ্যে একজন বাঁহাতির সংযোজন পেস ডিপার্টমেন্টে বৈচিত্র্যের সংযোজন ঘটাবে। বোলিংয়ে ভেরিয়েশন আসবে। বোঝাই যায়, এ চিন্তায় শরিফুলকে খেলানো হয়েছে। শরিফুলও তার প্রতিদান দিয়েছেন। নিজেকে মেলে ধরার আদর্শ পরিবেশকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন পঞ্চগড়ের এ ২৫ বছর বয়সী বাঁহাতি দ্রুতগতির সুইং বোলার।
তার নগদ পুরস্কার হিসেবে ক্যারিয়ারের ১৪ নম্বর টেস্টে আজ ২২ আগস্ট প্রথমবার ফাইফার পেলেন। প্রথম দিনই তার ঝুলিতে জমা পড়েছে ৬ উইকেট। কাল রোববার সকালে আরও উইকেট পেলে সেটা বাড়বে আরও।
আগের টেস্টে ঝলক দেখিয়েছিলেন আরেক পেসার হাসান মাহমুদ
ডারউইনে অসিদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে বাংলাদেশকে সামনে আগাতে সাহস ও শক্তি উপহার দিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। ম্যাকাইতে সেই কাজটিই করেছেন বাঁহাতি দ্রুতগতির বোলার শরিফুল। তার হাত ধরেই চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ের পরও ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায়নি বাংলাদেশ।
তাই ভক্তদের আফসোস-শরিফুল যদি আগে বোলিং করার সুযোগ পেতেন! বাংলাদেশ যদি টস জিতে ডারউইনের মতো প্রথম ফিল্ডিং করতো। তাহলে নির্ঘাত দেড়শোর নিচেই শেষ হতো অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস।
তাই বলা, ‘ব্যাড টস টু লুজ।’ সত্যিই টস হারটা একটু বেশিই ভোগালো। দেখা যাক, সামনের সময়ে তা পোষানো সম্ভব হয় কিনা!
এআরবি/এমএমআর







